মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

ঐতিহাসিক স্থান উয়ারী বটেশ্বর

কিভাবে যাওয়া যায়: 
ঢাকা থেকে মরজাল বাসষ্ট্যান্ডে নেমে সিএনজি যোগে বেলাব বাজার নামতে হবে। বেলাব বাজার থেকে রিক্সা যোগে উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে যাওয়া যায়।

উয়ারী-বটেশ্বর প্রত্নতত্ত্বের খনন কাজ চলছে।

 

নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় উয়ারী এবং বটেশ্বর পাশাপাশি দুটো গ্রাম। এই গ্রাম দুটোতে প্রায়ই বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান পাওয়া যেতো। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে উয়ারী গ্রামে শ্রমিকরা মাটি খননকালে একটি পাত্রে সঞ্চিত মুদ্রা ভাণ্ডার পায়। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক জনাব মোহাম্মদ হানিফ পাঠান সেখান থেকে ২০-৩০টি মুদ্রা সংগ্রহ করেন। এগুলো ছিলো বঙ্গভারতের প্রাচীনতম রৌপ্যমুদ্রা। এই ছিলো উয়ারী-বটেশ্বরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহের প্রথম চেষ্টা। তিনি তৎকালীন সাপ্তাহিক মোহাম্মদীতে "প্রাচীন মুদ্রা প্রাপ্তি" শীর্ষক সংবাদ ছাপেন। তিনি তাঁর ছেলে জনাব হাবিবুল্লা পাঠানকে সচেতন করে তুলছিলেন এই এলাকার বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সম্পর্কে। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে বটেশ্বর গ্রামে স্থানীয় শ্রমিকরা দুটি লৌহপিণ্ড পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে যায়। ত্রিকোণাকার ও এক মুখ চোখা, ভারী লৌহপিণ্ডগুলো ছেলে হাবিবুল্লাহ তাঁর বাবাকে নিয়ে দেখালে তিনি অভিভূত হোন। ঐ বছরের ৩০ জানুয়ারি দৈনিক আজাদ পত্রিকার রবি বাসরীয়সংখ্যায় "পূর্ব পাকিস্তানে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা" শিরোনামে একটি প্রবন্ধ ছাপেন জনাব হানিফ পাঠান। এরপর বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন প্রাপ্তির ঘটনার আমরা উল্লেখ পাই। ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে উয়ারী গ্রামের কৃষক জাড়ু মাটি খননকালে ছাপাংকিত রৌপ্য মুদ্রার একটি ভাণ্ডার পান। ওই ভাণ্ডারে কমপক্ষে চার হাজারের মতো মুদ্রা ছিল। ওজন ছিলো নয় সের। জাড়ু মুদ্রাগুলো আশি টাকা সের দরে রৌপ্যকারের কাছে বিক্রি করে দেন। হাবিবুল্লাহ পাঠান তখন নবম শ্রেণীর ছাত্র, তাই মাত্র ৳৭২০ টাকার জন্য ইতিহাসের অমূল্য সামগ্রীগুলো রৌপ্যকারের চুল্লিতে গলে চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলো। ১৯৭৪-১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে জনাব হাবিবুল্লাহ পাঠান ঢাকা জাদুঘরেরঅবৈতনিক সংগ্রাহক ছিলেন। তখন গবেষণার জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাপাঙ্কিত মুদ্রা, পাথরের গুটিকা, লৌহ কুঠার ও বল্লম জাদুঘরে অর্পণ করেন তিনি। ঐ সময় রাইঙ্গারটেক গ্রাম থেকে প্রাপ্ত ত্রিশটি লৌহ কুঠার জাদুঘরে প্রদান করেন তিনি। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে উয়ারী গ্রামের শাহবুদ্দিন মাটির নিচ থেকে ব্রোঞ্জের ৩৩টি পাত্রের একটি সঞ্চয় উদ্ধার করেন। বারবার ধরনা দিয়েও সেগুলো সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি, অথচ পরবর্তীকালে সেগুলো মাত্র ২০০ টাকায় এক ভাঙ্গারির কাছে বিক্রি করে দেন শাহাবুদ্দিন। জনাব হাবিবুল্লাহ পাঠান একসময় স্থানীয় শিশু-কিশোরদেরকে প্রাচীন প্রত্নসামগ্রী কুড়িয়ে দেয়ার বিনিময়ে সামান্য কিছু পয়সা দিতে লাগলেন আর সংগ্রহ করতে লাগলেন উয়ারী-বটেশ্বর এলাকার অনাবিষ্কৃত অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। তাঁর একাগ্র শ্রমেই খননের আগেই উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিলো বঙ্গভারতের দুর্লভ একক নিদর্শন বিষ্ণুপট্ট, ব্রোঞ্জের তৈরি ধাবমান অশ্ব, উচ্চমাত্রায় টিনমিশ্রিত নবযুক্ত পাত্র, শিব নৈবেদ্য পাত্র, রেলিক কাসকিট(Relic casket)-এর ভগ্নাংশ, পাথরের বাটখারা, নব্যপ্রস্তর যুগের বাটালি, লৌহকুঠার, বল্লম, পাথরের তৈরি সিলত্রিরত্ন, কচ্ছপ, হস্তী, সিংহ, হাঁস, পোকা, ফুল, অর্ধচন্দ্র , তারকা, রক্ষাকবচ(Amulate), পোড়ামাটির কিন্নর, সূর্য ও বিভিন্ন জীব-জন্তুর প্রতিকৃতি, রিংস্টোন, ব্রোঞ্জের গরুড়, কয়েক সহস্র স্বল্প মূল্যবান পাথর ও কাচের গুটিকা।

অনাবিষ্কৃত এই উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের সম্ভাবনা বহুদিন থেকেই তাই গুঞ্জরিত হচ্ছিলো। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দের দিকে স্থানীয় স্কুলশিক্ষক জনাব মোহাম্মদ হানিফ পাঠান (১৯০১-১৯৮৯)[] প্রথম উয়ারী-বটেশ্বরকে সুধী সমাজের নজরে আনেন। পরে তাঁর ছেলে জনাব হাবিবুল্লা পাঠান স্থানটির গুরুত্ব তুলে ধরে পত্রপত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন। প্রত্নতাত্ত্বিকরা বারবারই এব্যাপারে সোচ্চার থাকলেও হচ্ছিলো না উৎখনন। অবশেষে ২০০০ খ্রিস্টাব্দেজাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের উদ্যোগে শুরু হয় উৎখনন। খননকাজে নেতৃত্ব দেন উক্ত বিভাগের প্রধান জনাব সুফি মোস্তাফিজুর রহমান, উপনেতা হিসেবে ছিলেন জনাব মিজানুর রহমান, আর পুরো খননকাজেই সক্রীয় ছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থীবৃন্দ। আর স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও ছিলো উল্লেখ করার মতো। তাঁদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতে এগিয়ে আসে মোবাইল ফোন সেবাদাতা কোম্পানী গ্রামীণ ফোন। ৯ জানুয়ারি, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে নবম ধাপের উৎখনন যখন শুরু হয় তখন প্রথমবারের মতো আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা দিতে এগিয়ে আসে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়।[]

উয়ারী-বটেশ্বরে প্রত্নবস্তু খননে প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন দুর্গ-নগর, বন্দর, রাস্তা, পার্শ্ব-রাস্তা, পোড়ামাটির ফলক, স্বল্প-মূল্যবান পাথর ও কাচের পুঁতি, মুদ্রা-ভান্ডারসহ উপমহাদেশের প্রাচীনতম ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। উল্টো-পিরামিড আকৃতির স্থাপত্যটি নিয়েও বিশেষজ্ঞ স্থপতিরা ইতোমধ্যে গবেষণা শুরু করেছেন।[] এখানে পাওয়া চারটি পাথুরে নিদর্শন প্রত্নপ্রস্তরযুগের বলেই মনে হয়। নব্যপ্রস্তর যুগের হাতিয়ার প্রাপ্তির আলোকে বলা যায়, খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে এগুলো এখানে ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। বিপুল পরিমাণ লৌহ কুঠার ও বর্শাফলকের সময়কাল এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে ড. জাহানের রাসায়নিক পরীক্ষার ভিত্তিতে এগুলো ৭০০-৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের বলে ধারণা করা হচ্ছে। ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রাগুলো মৌর্যকালপর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ৩২০খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৭) প্রচলিত থাকার সম্ভাবনা। কাচের গুটিকাগুলো সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতক থেকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিলো। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় শিল্পকলা চর্চার আন্তর্জাতিক কেন্দ্রের উদ্যোগে উয়ারীতে প্রত্নতাত্তি্বক উৎখননে প্রাপ্ত উত্তর ভারতীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র, রোলেটেড মৃৎপাত্র, নব্ড মৃৎপাত্র প্রভৃতির দুটি কার্বন-১৪ পরীক্ষা করা হয়। ঐ পরীক্ষায় উয়ারীর বসতিকে খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।[]

সোনারুতলা গ্রাম থেকে একটি পাথরের ও অন্যটি পোড়ামাটির নিবেদন স্তূপ(Votive stupas) পাওয়া যায়। এগুলোর নির্মাণ পদ্ধতি এবং পোড়ানোর কারিগরি বিষয়ে ধারণা হয় এগুলো তাম্রপ্রস্তর যুগে ব্যবহৃত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গেপাণ্ডুরাজার ঢিবিতে তাম্রাশ্মীয় পর্বে(খ্রিষ্টপূর্ব ১৬০০-খ্রিষ্টপূর্ব ১৪০০) বসতি স্থাপনকারী মানবগোষ্ঠী ধান্য তুষের ছাপ সংবলিত ধূসর, রক্তিম ও কৃষ্ণবর্ণের মৃৎপাত্র নির্মাণ করেছে। কাদামাটিতে ধান বা ধানের তুষ মিলেয়ে ইট ও মৃৎপাত্র নির্মাণের ঐতিহ্য এঅঞ্চলে দীর্ঘকাল থেকে চলে-আসা সংস্কৃতির স্বাক্ষর।[]

উয়ারী গ্রামে ৬৩৩ মিটার দীর্ঘ বাহুবিশিষ্ট বর্গাকৃতি গড় ও পরিখা রয়েছে। পূর্ব পাশের পরিখাটি ছাড়া গড় ও পরিখার চিহ্ন লুপ্তপ্রায়। ৬ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যবিশিষ্ট আরেকটি বহির্দেশীয় গড় ও পরিখা সোনারুতলা গ্রাম থেকে শুরু করে বটেশ্বর হানিয়াবাইদ, রাজারবাগ ও আমলাব গ্রামের ওপর দিয়ে আঁড়িয়াল খাঁ নদের প্রান্তসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত। এটিকে স্থানীয় লোকজন "অসম রাজার গড়" বলে থাকেন। এরূপ দুটো প্রতিরক্ষা প্রাচীর গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক বা প্রশাসনিক কেন্দ্রের নির্দেশক, যা নগরায়ণেরও অন্যতম শর্ত।[]

২০০৪ খ্রিস্টাব্দের মার্চ-এপ্রিলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎখননে উয়ারী গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে ১৮ মিটার দীর্ঘ, ৬ মিটার প্রশস্ত ও ৩০ সেন্টিমিটার পুরু একটি প্রাচীন পাকা রাস্তা। রাস্তাটি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে ইটের টুকরা, চুন, উত্তর ভারতীয় কৃষ্ণ মসৃণ মৃৎপাত্রের টুকরা, তার সঙ্গে রয়েছে ল্যাটারাইট মাটির লৌহযুক্ত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র টুকরা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের প্রধান ড. সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এটিকে আড়াই হাজার বছর পুরনো বলে দাবি করেছেন। এসম্পর্কে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক দিলীপ কুমার চক্রবর্তীর অভিমত: এতো দীর্ঘ ও চওড়া রাস্তা এর আগে পুরো গাঙ্গেয় উপত্যকায় দ্বিতীয় নগরায়ণ সভ্যতায় কোথাও আবিষ্কৃত হয়নি। গাঙ্গেয় উপত্যকায় দ্বিতীয় নগরায়ণ বলতে সিন্ধু সভ্যতার পরের নগরায়ণের সময়কে বোঝায়। ফলে যেটি আবিষ্কৃত হয়েছে বলা হচ্ছে তা তধু বাংলাদেশেই নয়, সিন্ধু সভ্যতার পর ভারতবর্ষের সবচেয়ে পুরোন রাস্তা।[]

পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও আঁড়িয়াল খাঁ নদের মিলনস্থলের অদূরে কয়রা নামক একটি শুষ্ক নদীখাতের দক্ষিণতীরে বন্যাযুক্ত গৈরিক মাটির উঁচু ভূখণ্ডে উয়ারী-বটেশ্বরের অবস্থান। ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় আদি ঐতিহাসিক কালপর্বে এ প্রত্নস্থানকে বহির্বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে অধিকতর স্পষ্ট করেছে। টলেমির বিবরণ থেকে জনাব দিলীপ কুমার চক্রবর্তীর অনুমান আদি ঐতিহাসিক যুগে উয়ারী-বটেশ্বর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও রোমান সাম্রাজ্যের মালামাল সংগ্রহ ও বিতরণের সওদাগরি আড়ত (Entry port) হিসেবে কাজ করতো। তাঁর এই ধারণাকে দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন সুফি মোস্তাফিজুর রহমান।

অবস্থান: 
উয়ারী-বটেশ্বর, বেলাব, নরসিংদী।